মানুষের যাপনের গল্পগুলো আসলে নানা রকমের। যাকে আমরা রূপকথা বলে থাকি! তার চেয়ে কম কিছু নয়। আপাত ভাবে মনে হয় এই চলমান সভ্যতার ভিতরে ভিতরে একটা একঘেয়েমি প্রাণ পাচ্ছে প্রতিদিন। অথচ যাঁরা মানুষের ইতিহাসের কারবারি তাঁরা জানেন – কী বিচিত্র এই যাপন। কত যে তার বাঁক, কত যে তার বদল। এই বদলে যাওয়া গল্পে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে বাড়িঘর ছাতা জামা থেকে আস্ত আস্ত রান্নাঘর। খুব চেনা হাড়ি পাতিল হাতা খুন্তির বাইরে গিয়ে মানুষের অভিপ্রয়াণকে সে আশ্রয় দিচ্ছে প্রতিদিন। তাকে গেরস্থালির গপ্পো বলে সরিয়ে রাখলে চলবে না। কত শত রাজনৈতিক ভাষ্য যে তার মধ্যে প্রাণ পাচ্ছে সে কথা খানিক খোলসা করে বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। মানুষের অভিপ্রয়াণ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা ইতিহাস-ভূগোল পেরিয়ে এক ধরণের সাংস্কৃতিক যাত্রাকে খুঁজে চলেছেন প্রতি নিয়ত। দেশ কালের নিরিখে সেই যাত্রার স্বরূপ ভিন্ন ভিন্ন। সেসব যাত্রাপথ পেরিয়ে খাদ্য-খাবারের কতই না ভিন্নতর যাপন প্রাণ পেয়েছে সময়ে সময়ে। আজকে অনেক দূর থেকে দেখলে তাকে রূপকথা বলে ভ্রম হয় বৈকি। ঘরে ঘরে সংক্রান্তির পিঠে হয় আজও। সেই পিঠে কি আর্যদের হাতে গড়া পুরোডাশের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে? … আনে না। এতটাই বদলে গেছে সেই পুরোডাশের আদলখানি যে চলমান সভ্যতার ভিড়ে মিশে গিয়ে আজ তাকে আর চেনাই যায় না। ষোড়শ শতকের শেষের দিকে লেখা হয়েছিল আইন-ই-আকবরি । সেই গন্থে রান্নার কথা ছিল, রান্নার বিবরণ ছিল। উত্তর ভারতে বসেই লেখা হয়েছিল এই বই। আমরা লক্ষ করবো, সেখানে কোথাও লঙ্কার উল্লেখ নেই। যদিও দক্ষিণ ভারতে তার আগেই লঙ্কা পৌঁছে গেছে। শুধু লঙ্কা কেন, কত না মশলার গল্পে মিশে আছে মানুষের যাত্রাপথ। সে পথে রক্তপাত হানাহানি সন্ধি ছিল অনিবার্য। সেসব ইতিহাস পেরিয়ে এসে দেখি, এই চলমান মানুষের যাত্রা আজও অব্যাহত। পৃথিবীতে সম্ভবত মানুষের অভিপ্রয়াণ একটি চিরপুরাতন অথচ চিরনবীন ঘটনা। সেই জায়মান সমস্যাপট দেশ কাল ছুঁয়ে বঙ্গদেশের ভিটে মাটিতেও ছায়া ফেলে গেছে বারবার। সেই ছায়া সরে সরে গেছে মানুষের হাত ধরে। কখনও আন্দামান কখনও ত্রিপুরা হয়ে পাঞ্জাবের অলিতে গলিতে সে ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের দাবী নিয়ে। বাস্তবিক ছড়িয়ে পড়েনি কেবল, ছড়িয়ে পড়ছেও। এই জঙ্গম ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে কার না ইচ্ছে করে! ব্রিক লেনের বাঙালিটোলার মতোই রোমাঞ্চকর হয়ে উঠতে পারে এসব বসতবাটির গল্প, তেল নুন লকড়ির গল্প। নিজেরদের মতো করে মানুষের খাদ্য-খাবারের নৃতত্ত্বকে খুঁজে দেখার একটা ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছিল আমাদের(আমার এবং আমার স্বামী,অমিত সেন) ভিতরে ভিতরে। সেই তাগিদেই আগরতলার গ্রাম থেকে মিডল আন্দামানের বাম্বু টেকরি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে একটা আভ্যন্তরীণ তাগিদ। রেঙ্গুন শহরের অলিগলি কালী মন্দির থেকে মাছের বাজার, এই সমস্তই যেন এক জঙ্গম চিত্রশালা। ভারী অবাক করা সেই উপন্যাসোপম মানবজীবন এবং তার নিত্যদিনের রান্নাঘর। চলুন, আমরা বরং সেই গল্পেই তলিয়ে যাই।

আজকে যাকে বঙ্গদেশ বলে চিনি, সে তো ঠিক এমনটা ছিল না বরাবর। মানচিত্রে মানুষের গল্প লেখা থাকে না। সে গল্পকে খুঁজে নিতে হয় জন-অরণ্যে। কিন্তু যে অরণ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে! তাকে খুঁজবো কেমন করে? তার কাছে পৌঁছানো কি সহজ? এইসব প্রশ্নে তলিয়ে গিয়ে অভিবাসী বাঙালির খাদ্য-খাবারের একটি নৃতাত্ত্বিক ভাষ্যের খোঁজ করার ইচ্ছে হলো। একে আপনারা ব্যক্তিগত খেয়াল বলতে পারেন। আসলে একদা নির্মিত কোনো এক বৃহত্তর কৌমের খোঁজ আমায় দিয়ে বা বলা ভালো আমাদের দিয়ে এমন একটি ভ্রাম্যমাণ যাপন করিয়ে নিয়েছে ক্রমে। ঠিক কোন বাঙালিকে আমরা খুঁজছি? যে বাঙালি তাঁর ভিটে মাটি ছেড়ে চলে গেছে, বাধ্য হয়েছে চলে যেতে। এবং তার এখনকার ভৌগোলিক যাপন এক ধরণের সংবদল ঘটিয়েছে সব অর্থেই। অবশ্যই সেই অভিপ্রয়াণে খানিক খানিক করে বদলে গেছে তার রান্নাঘরখানি। যাকে ইংরেজিতে বলা যেতে পারে diasporic Bengali food, আমাদের খোঁজ তাকে ঘিরেই। সেই সূত্রেই আমাদের নানাদিকে যাওয়া। এক অব্যাহত খোঁজই আমাদের দিয়ে একটা যাত্রাপথ তৈরি করে নিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। তাকে গল্প বলে ভ্রম হতে পারে। কিন্তু সে সত্য, সে বাস্তব। সেই গল্পের খানিক আঁচ পোহানো যাক আপাতত। দেশভাগের কথা এখানে এসে পড়বে এই তো স্বাভাবিক। বাস্তুহারা মানুষের ভিড়ে তখন ভরে উঠেছে শিয়ালদা স্টেশন। সেই ছবি আমাদের চেনা। সেই ভিড় পেরিয়ে সরকারি খাতায় রেজিস্ট্রেশন করালে তবে না বাস্তুহারা মানুষ উদবাস্তু হবে! সেইসব উদবাস্তু মানুষের আবার নানা ভাগ হবে। সেই ভাগে ভাগে তারা পৌঁছে যাবে ক্যাম্পে ক্যাম্পে। সেখান থেকে আবার কোনো কলোনিতে। দীপাঞ্জন রায়চৌধুরী তাঁর ‘প্রবাস জীবনের কথা’য়(১ম ও ২য় খণ্ড) বিজয়গড় আজাদগড়ে সেই কলোনি পত্তনের দিনের কথা লিখেছেন ভারী যত্নে। এই নতুন কলোনির জীবন তো আসলে প্রবাস জীবনই। বিজন ভট্টাচার্যের লেখা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন, জলের দ্যাশের মানুষ কি ভেবেছিল – লাইন দিয়ে কলের জল ভরতে হয়! রেশনের চালের ভাতে গুমো গুমো গন্ধ। কারা যেন বলেছিল এসব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের চাল, মজুত করা ছিল গুদামে। গল্পেরা মুখে মুখে প্রাণ পায়। এ যেন এক কুহকী যাদুবাস্তবতা। মার্কেজের ‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’কে মনে পড়িয়ে দিতে পারে এইসব কলোনি-কথামালা। কিন্তু তাও তো যাদবপুর, লায়েলকার মাঠের গল্পেরা একরকম, যাঁরা কয়েকদিনের ক্যাম্পবাস কাটিয়ে জাহাজে উঠলেন! কালাপানি পেরোবেন যারা! তাঁদের গল্প আরেক রকম। এই উদবাস্তু প্রকল্পে, আন্দামানের প্রত্যন্ত দ্বীপ গুলিতে যাঁদের পাঠানো হয়েছিল, তাঁরা মুখ্যত দক্ষিণ বঙ্গের নমশূদ্র। কৃষিজীবী এবং মৎসজীবী – এই নমশূদ্রদের হাতের এবং পায়ের গড়ন পরীক্ষা করা হয়েছিল। আসলে যাচাই করা হয়েছিল, তারা দুর্গম দ্বীপে আদৌ টিকে থাকতে সক্ষম কিনা। নোনাজলের সমুদ্র পেরিয়ে মানুষেরা পৌঁছেছিল উর্দিগুদামে(পোর্ট ব্লেয়ার)। সেখান থেকে আবার এদিক সেদিক। কেউ কদমতলায়, কেউ দিগলিপুরে। কদমতলার যাঁরা প্রাচীন তাঁরা বলেছেন সেদিনের কথা। যাঁরা দিগলিপুরে গিয়েছিলেন, তাঁরাও জানিয়েছেন। সে স্মৃতি কে আর ভোলে! জাহাজ থেকে নামার পরে পাতার ছাউনি ঘেরা ঘর জুটেছিল একখানা করে। গরমগরম ভাত আর হরিণের মাংসের ঝোল রান্না হয়েছিল। এসব দ্বীপে ছাগল মুরগি আর কোথায়! বুনো জংলি আম, জঙ্গলের কলা আরও কত কত ফল। খানিকটা পাটপাতার মতো দেখতে একটা গাছ। জনৈক গায়েন স্যারের মা, সেই পাতা রান্না করে দিতেন। উদবাস্তুদের কিছুকাল আগে আসা রাঁচিওয়ালারা(ঝাড়খণ্ড থেকে যাঁরা এসেছিলেন) সেই পাতার নাম দিয়েছিল বকরি পাতা। মানুষেরা কাঁদা ঘেঁটে ল্যাটা আর কই ধরতেন। বেতের ডগা রান্না হতো। ধানের বীজ দিয়েছে বটে সরকার, হাল বলদ তো আর নেই। এত বছরের ভার্জিন ল্যাণ্ড। পাতা পচা সারের পাহাড়। মানুষেরা কেবল মুঠো মুঠো ধান ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে যেন এক আদিম চাষাবাদ। ভোলা বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের মানুষ, ইলিশ খেয়ে বড় হওয়া মানুষ আর কখনও সেই দ্যাশের মতো ইলিশ খায়নি। সমুদ্রের ইলিশ ভারী বিস্বাদ। তবু তো মাছ ছিল, কচু ছিল। ডোলের টাকা বন্ধ হওয়ার পরে সেই ছিল পুনর্বাসিত মানুষদের পুঁজি। কিন্তু কেবল কি এই উদবাস্তু বাঙালিরাই ওসব দ্বীপ আর ভূগোলে ছড়িয়ে ছিল? ১৯২২-২৩ সালে ব্রিটিশ ভারতে মানুষের আমদানি রপ্তানি জারি ছিল। বার্মার ক্যারেন উপজাতির মানুষদের গৃহযুদ্ধের সুযোগে পুনর্বাসনের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাদের বসতি গড়ে উঠলো মায়াবন্দরের কাছে, গর্জন গাছের ছায়া ঘেরা সেই গ্রাম। জাড়োয়াদের সঙ্গে তাদের বিবাদ হয়নি কি! হয়েছে। হওয়ারই কথা ছিল। আর এসেছিল রাঁচিওয়ালারা। এই ক্যারেন উপজাতির মানুষেরা আর রাঁচিওয়ালারা ছিল জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে দক্ষ। জঙ্গল পরিষ্কার করে উদবাস্তু মানুষদের জন্য পাতার ছাউনি গড়তেও তো শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন। সেল্যুলার জেলের কনভিক্টরাও রয়ে গেল আরেক রকম করে। এই সব মিলিয়ে আন্দামানের জনজীবন আর রান্নাঘর অন্য একটি স্বাদের গল্প বুনে চলল দিনে রাতে। বরিশালের যে মানুষ আর কখনও তার ফেলে আসা দেশকালে ফিরে যেতে পারেনি, নিদেন পক্ষে যেতে পারেনি আন্দামানের বাইরেও, তার রান্নায় ফিউশন খোঁজা অন্যায়। বরং সে আপনাকে বাতলে দিতে পারে অচেনা অজানা ঘেরা ফুলের(জিন্দাবালি/গিরিপুষ্প) রান্না। যে ঘেরাফুলের গাছ দিয়ে তারা উঠোন ঘেরে, চ্যালায়(বিছে) কামড় দিলে যে পাতার রস তারা ক্ষতে দেয়, সেই ফুলের কি বড়া হয়? মানুষেরা খেয়ে খেয়ে দেখেছেন সেসব। এও যেন এক আদিম পাঠশালার পাঠ। সেই পাঠ শিখতে শিখতে আন্দামানের তামিল জেলে বস্তিকে ছুঁয়ে আজকের বাঙালি রান্নাঘর থেকে তারিণী মাছের খাট্টা সুরুয়ার গন্ধ ভেসে আসে। রান্নাঘর এইভাবে এক জঙ্গম যাপনের সাক্ষি হতে থাকে নিরন্তর।

আসলে আন্দামানের গল্পটা এক রকম। ত্রিপুরায় কিন্তু সেরকম ঘটেনি। এ তো আর ছাপছবি নয়! ত্রিপুরায় যাঁরা গিয়েছিলেন তাঁরা মূলত কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ। তাঁরা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। তাঁরা জমি কিনতে পেরেছিলেন। ত্রিপুরার আদি মানুষদের পাশাপাশি তাঁরা এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ক্রমে ত্রিপুরায় বাঙালি সরকার গড়ে উঠেছিল। এই রাজনৈতিক সমীকরণের পরেও আগরতলার রান্নাঘরে ত্রিপুরী রান্নারা প্রতিদিন মিলেমিশে যাচ্ছে। সিদলের গন্ধে ভরে উঠছে চৌমুহনি বাজার। গোদক রান্না হচ্ছে ঘরে ঘরে। আপনার মনে হতে পারে, জুমচাষের টং ঘরের গন্ধ কীভাবে বাঙালি বসতির দেওয়ালে শিকড় ছড়িয়ে দিচ্ছে! এ ভারী অদ্ভুত। রান্নাঘর এসব গল্পের লাটাইখানা গড়িয়ে গড়িয়ে দিচ্ছে দিনে রাতে। পুঁটির শিদল দিয়ে যে গোদক রান্না হয় ত্রিপুরি বাড়িতে তার কি কোনো নিরামিষ রান্না সম্ভব? পুঁটির শিদল না হলে যে রান্না অর্থহীন, সেই রান্নাকে কুমিল্লার মাসীমা আবিষ্কার করেছেন নিরামিষ ভাষ্যে। এভাবে রান্নারা বদলে যায়, বলা ভালো – প্রাণ পায় অথবা হারিয়ে যায়। মনে হতে পারে এসব কথা মন গড়া। খানিকটা চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জনের জন্য পৌঁছে যাওয়া যেতে পারে বারাসাতের বার্মা কলোনিতে। সেখানে ঠেলাগাড়িতে মোহিঙ্গা বিক্রি হয় প্রতিদিন। অথবা সুভাষগ্রামের বার্মা কলোনিতেও চলে যেতে পারেন একদিন। বিলি ব্যবস্থার প্লটে প্লটে বাড়ি। সেই বাড়ির আলমারিতে কবেকার কোন বার্মা যাপনের ছাপ। ল্যাকারের প্যাঁচা, উনো খাওসোয়ে খাওয়ার চিনেমাটির বাটি আরও কত কী! ছোটোবেলার রেঙ্গুনের স্মৃতিতে ডুবে গিয়ে ওসব পাড়া এখনও স্মৃতি মেদুর হয়ে ওঠে। কিন্তু যাঁরা রয়ে গেলেন রেঙ্গুন শহরখানা আকড়ে? যারা পুনর্বাসনের আশ্বাস পেয়েও ফিরে এলেন না! তাদের রান্নাঘর দর কষাকষি করে ইরাবতীর ইলিশ কেনেন। সেই ইলিশে আদার রস, ফিস সস মিশিয়ে নাথালাং পঙ রান্না হয়। লেমন গ্রাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে পড়তে বাঙালি জীবনের গন্ধ অপসৃয়মাণ হতে থাকে অনবরত। চা পাতার স্যালাড দিয়ে ভাত খেতে খেতে বাঙালি করণিক নতুন ভাবে রান্নাঘরকে আবিষ্কার করেন হয়তো বা। রেঙ্গুনই শুধু নয় তো। টাউঞ্জি থেকে ম্যাণ্ডেলে হয়ে বাঙালি আর বার্মিজ খাবারের এই বদল ও সংমিশ্রণ পেরিয়েও তামিল বিহারি বা রাজস্থানি স্বাদের সহাবস্থানকে বুঝতে হবে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার পুরনো মানচিত্রকে মাথায় রেখে। সকাল সকাল গরম ভাতের সঙ্গে মরিচ ডলে যে বার্মিজ ছেলে সিঙ্গারা আর কাঁচালঙ্কা খায় তাকে আজ আলাদা করে খাবারের ইতিহাস বুঝিয়ে বলা অবান্তর। অভিপ্রয়াণের সবচেয়ে বড় গুণ সে এমন সুন্দর করে মানুষের স্বাদকে অন্য স্বাদের সঙ্গে মিলিশে মিশিয়ে দিতে পারে যে খিদেকেই তখন মানবধর্মের একমাত্র মুখ বলে বোধ হয়। সেই খিদেই পারে শাহজাদপুর থেকে আসা নিরন্ন বাঙালি মা’কে অমৃতসরে পৌঁছে দিতে। মানুষের মুখে মুখে কাঁটাতারের এপারে ওপারে একথা ছড়িয়ে গিয়েছিল যে, ওখানে খাবার আছে। ভাত না হোক লঙ্গরখানার রুটি আছে, ডাল আছে, হালুয়া আছে। ওসব তো কেবল খাবার না, ঠাকুরের প্রসাদ। এ শহরে(অমৃতসর) মানুষ না খেয়ে মরে না। এইসব ভেবে ভেবে মানুষের মিছিল এসে পৌঁচিয়েছে এখানে। ভাষা জানা নেই, রাস্তা চেনা নেই, তবুও তো ঝুপড়ি ভাড়া করে জীবন কাটিয়েছে মানুষ। আতপের ভাত মুখে রোচে না। সেদ্ধ চাল তখন আর কই! এসব মনে হতে পারে খুব সামান্য বিলাসিতা। কিন্তু মানুষের মন তো, মানুষের জিভ তো। সে কেবল চেনা স্বাদের আশ্রয়ে ফিরতে চায়। মাছ ভাতের কাছে ফিরতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর সেসব পাওয়া যায় না। বরং বাঙালি কলোনিতে মাছের বাজার বসে ইদানীং কিন্তু সেই বাজার খানিক অন্যরকম। হোটেলে হোটেলে শোলমাছের শরীর বিক্করি হয়ে যায়। গেট হাকিমার বাঙালি কলোনিতে শোল মাছের মাথা দেদার বিকোয়। দেশজ বাজারের কিছু কিছু প্রান্তিক চেহারাকে যাঁরা খুঁজে নিতে চান – এসব বাজার তারা ঘুরে দেখতে পারেন। শোল মাছের মুড়োর পাতুরি থেকে পুদিনা পাতার ঝোল এসব রান্নাঘরকে ভরিয়ে রাখে তাই। হিমাচলে আপেল যখন ভারী সস্তা হয়ে যায়! অমৃতসরের রাস্তায় রাস্তায় ভারী সস্তায় বিক্রি হয় সেসব। পাকা আপেল দিয়ে চাটনি রান্না করেন তখন শাঁখা-পলার হাত। ঠিক চাটনি না, তেঁতুল দিয়ে আপেলের টক। যেমন গরম কালে দেশে থাকতে তারা খেতেন! আনাজ দিয়ে, মাছ দিয়ে। শহরের কাবাডিওয়ালা বলে যারা চিহ্নিত, তাঁদের জীবনের উচ্ছ্বাস, বাঁচার তাগিদ আর রান্নাঘরের ছবি দেখে অবাক হতে হয়। কেউ এসেছেন পূববাংলা থেকে, কেউ বা নবদ্বীপ, কেউ আবার হুগলির গ্রাম ছেড়ে – এই সংমিশ্রিত কলতানে, রাম নবমীর কল্লোলে বাখতিন নির্দেশিত বহুস্বরকে আপনি খুঁজে পাবেন একথা ঠিক জানি। কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নয় কিন্তু এমন কথা শোনা গিয়েছিল যে, ব্রিটিশ ভারতে পাটিয়ালার মহারাজার অনুরোধে প্রায় একশো ঘর বাঙালিকে অমৃতসরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শহর পরিষ্কারের কাজে। আজকের পরিভাষায় যাদের বলা যেতে পারে কাবাডিওয়ালা। সেই একশো বছর আগের কৌম ভেঙে গেছে। কিন্তু অমৃতসর শহরে বাঙালি অভিপ্রয়াণের একটি মানচিত্র তৈরি হয়েছে এই কাবাডিওয়ালাদের কলোনি ঘিরে। শ্রম থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব কিছু নিয়েই তাঁদের ভিতরে জন্ম নিয়েছে জাতিসত্তার খোঁজ। এই বাঙালি তার খাদ্যাভাসকে এক ভাবে আয়ত্ত করেছিল এবং ক্রমে পাঞ্জাবী খাবারের সঙ্গে তার যাপন মিলেমিশে গেছে। মানুষের মাইগ্রেশন যে এমন করে রান্নাঘরকে একটা আলাদা মাত্রা দেবে সেকথা কেইবা ভেবেছিল! কিন্তু যত দেখি তত বেশি করে টের পাই, নৃতত্ত্বের দর্শনে এই রান্নাঘরের একটি অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে। বাঙালির জাতিসত্ত্বাকে সে যে কোনো কারণেই হোক এই যে অভিপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে অন্য একটি স্বাদ-ভূগোলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বা দিচ্ছে। ক্রমান্বয়ে তার মধ্য দিয়ে জন্ম নিচ্ছে জীবনের ভিন্নতর নানা রকমের স্বাদ-কোরক। বিয়েবাড়ির রান্না থেকে মুখেভাতের রান্নায় তার ছাপগুলো ভারি স্পষ্ট। নিরামিষ হেঁশেলের ডালমাখানি রান্না হচ্ছে জিরা বাটায় আর গোটা জিরা সম্বরে। থিতু হওয়া এই নতুন জীবনের বিবিধ স্বাদকে সাধ্যের মধ্য দিয়ে ছুঁতে চাইছে বাঙালটোলার দিনরাত। রাজনৈতিক আনুগত্যের উর্দ্ধে উঠে এই সম্মিলিত কণ্ঠ এখন বিকাশ চায়। পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশ, সামগ্রিক বিকাশই এখন লক্ষ্য। সেই যে শোনা গিয়েছিল, ব্রিটিশ ভারতে একদল বাঙালিকে পাঞ্জাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জমাদারের কাজে! সেই বাঙালিটোলা আজ জনস্রোতে মিশে গেছে, তাকে আর খুঁজেও পাওয়া যায় না। কিন্তু তার বদলে এই যাদের পেলাম সেই বা কম কী! কচুর লতি থেকে কচি সবুজ পটল এসব বাজারে আপনি পেয়ে যাবেন অনায়াসে। চাহিদা অনুযায়ী জোগানের যে গল্প সেই গল্পে বাঙালির অভিপ্রয়াণও খানিকটা ভূমিকা রেখে গেল। এসব পাড়ায় ঘুরলে এখনও আপনি সকালে সন্ধ্যায় ভাত ফোটার গন্ধ পাবেন। কাঠের জ্বাল ঠেলে ঠেলে জিরা মরিচ বাটায় মাছের ঝোলের গন্ধ পাবেন। আপাত ভাবে আপনি টের পাবেন না, এসব বাজারের পত্তনে কত লড়াই মিশে আছে। গুরদ্বারার কাছাকাছি মাছের বাজার বসানোও যে কী কঠিন লড়াই! স্বাদের লড়াই আসলে এসব। দেশভাগ আমাদের পরিচিত কত কিছুকেই তো বদলে দিয়েছে! অমৃতসর সংলগ্ন পাঞ্জাব মূলত ছিল কৃষিজীবী এবং নিরামিষাশী। দেশভাগের পরে পেশোয়ার বা রাওলপিণ্ডি থেকে আসা মানুষেরা আমিষ স্বাদকে বহন করে আনেন এ পাড়ে। তার সঙ্গে এসে মেশে গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডের সুরগুলি। এইসব সুর কেবল বাটার চিকেনের জন্ম দেয়নি! ভাটি জ্বালিয়ে গরম গরম রুটি সেঁকা ধাবাকেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। সানঝা চুলহা বলতে দেশভাগ পূর্ববর্তী পাঞ্জাব বুঝতো কমিউনিটি উনোন বা সিঙ্গেল উনোন। মায়েরা মেয়েরা সেখানে এক সঙ্গে রুটি বানাতেন, অনেকটা বাঙালিনীদের পিঠে বানানোর মতোই। এই কৌম ভেঙে গেল। দেশ ভেঙে গেল কৌম কি আর টিকে থাকতে পারে সবসময়! সে তখন ধাবার চেহারা নিয়ে ফিরে আসে পৌরুষের ছাঁদে। একেও এক রকম করে ফুড মাইগ্রেশন বলতে হয়।

তবে, কেবল তো দেশভাগ নয়! বাঙালির অভিপ্রয়াণের কারণ বিবিধ। তার জন্যে হাতের সামনেই রয়েছেন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, কবিকঙ্কণ চণ্ডী’র প্রণেতা। সেই কবে ডিহিদার মামুদ শরিপের অত্যাচারে তিনি ভিটেমাটি ছেড়ে, বর্ধমানের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। পথে এক মুঠো ভাতের জন্য শিশুপুত্র কান্নাকাটি করছে। এই আমাদের বর্ধমানের মানুষ, যে মাটিতে সোনা ফলে। সেই গ্রামের মানুষ ভাতের খিদেয় কাঁদে? আসলে ঠিক কাঁদে কিনা জানা নেই তবে সময়ে সময়ে বর্ধমানের মানুষ, হুগলীর মানুষ স্থানান্তরিত হয়েছেন নানা কারণে। তখন বাংলার গ্রামে গ্রামে ছেলেভুলানো ছড়ায় বর্গীর ছায়া এসে পড়েছে। একদল মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছেন তারা? মুকুন্দরাম গিয়েছিলেন আড়রা গ্রামে। এরাও বুঝি মেদিনীপুর পেরিয়ে উড়িষ্যায় গিয়ে পৌঁছোচ্ছেন। গ্রামের নাম কলরাবঙ্কা, কটকের একটি গ্রাম আসলে। চোদ্দপুরুষ আগে সেই চলে যাওয়া মানুষেরা নিজেদের মতো করে একটি কৌম গড়ে তুলেছেন। মাইগ্রেশন তাহলে কৌমকেও আদল দেয়! টিকে থাকার কী আশ্চর্য প্রকৌশল। সেই কৌম বর্ধমানের মতো করে রান্না করে, উড়িষ্যার মতো করে পাখাল ভাত খায়। তাঁদের চলে যাওয়ার আরও পরে পোস্ত এত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, পোস্ত নিয়ে কত লড়াই কত কিছু। অথচ এই বর্ধমানের কৌম দেশকে ছুঁয়ে থাকতে চায়। তারা তাই পোস্তকে আশ্রয় দিয়েছে ভাঁড়ারে। পাখাল ভাতে পোস্তবাটা মিশিয়ে খেলে আর কিছু না হোক ফেলে আসা ভূখণ্ডকে ছুঁয়ে থাকা যায় অন্তত। তবে, সবাই কি আর চাইলেই পারে! সম্ভব হয় না আসলে সব সময়। বাঙালি তো জেনেটিক রেস নয়, লিঙ্গুইস্টিক রেস।তার ইতিহাস বড় কম বিচিত্র নয়। সম্প্রতি পরিমল ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘সাতগাঁ’র হাওয়া তাঁতিরা’ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বলি, পরিমল বাবু আদি সপ্তগ্রাম, সরস্বতী নদী এবং বাংলার ইতিহাসের সঞ্চিত পলিস্তরে নিমজ্জিত এক অপরূপ ইতিহাসের মায়া সৃজন করেছেন এই উপন্যাসে। যাপন থেকে ধর্মকে ছুঁয়ে রান্নাঘর অবধি সেই গল্প গড়িয়ে গেছে অনায়াসে। ক্রীতদাসের ব্যবসা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বন্দরকে স্পর্শ করে আছে এই কথকথার সীমা। এই সূত্রে মনে পরে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যার ‘পদসঞ্চার’এর কথা। সেই কথালাপই আমায় মনে পড়ায় মেদিনীপুরের খেজুরি গ্রামের কথা। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত মানুষদের ঠিকানা হয়ে আছে যা আজও। তাঁদের রান্নার গল্পে কোনোদিন ঢুকে পড়তে পারি যদি! সেই ভেবেই বিষ্ময়ের অবধি থাকে না। গল্পের লোভ ভারী বিষম বস্তু। সেই গল্পের টানেই তো রান্নাঘর থেকে রান্নাঘরে ঘুরে বেড়াই। এই গরমের দিনে পটলের দোলমা রাঁধতে রাঁধতে ফিরে যাই আর্মেনিয়ান চার্চের কাছে। পুরাণ ঢাকার গলি, আর্মেনিয়ান জমিদারদের গল্প অথবা ফরাসগঞ্জের হাটকে ছুঁয়ে আছে যে ইতিহাস – সে কি মাটন/বিফ গ্লাসির খোঁজ রাখে? আজকের রান্নাঘর কি ইতিহাস প্রিয়? এর কোনো সদুত্তর নেই আমার কাছে। আমি কেবল দেখেছি চর্বিতে জ্বাল দিয়ে দিয়ে কুরবানি ঈদের মাংস সংরক্ষণ করে বাংলাদেশের মানুষ। এই সংরক্ষণের সাক্ষর রেখেছিলেন আর্মেনিয়ানরাই একদা। গ্লাসি রান্নার ছাপ যেমন রয়ে গেছে, তেমনই সেই রান্নাকে মুক্তি দিয়েছেন নানী খালা আর মায়েরা মাছের শরীরে। বোয়াল মাছের গ্লাসির কথা হয়তো আর্মেনিয়ানরা ভাবতেও পারতেন না। এই না ভাবার মতোই কত কত কাজ করিয়ে নেয় মানুষের অভিপ্রয়াণ। সে একই সঙ্গে ফেলে আসা ভূখণ্ডকে ছুঁয়ে থাকার আকূলতাকে প্রকাশ করতে চায়, টিকে থাকতে চায় মানুষের দাবী নিয়ে। তার অর্থনৈতিক অবস্থান তো বটেই, এই উপমাহাদেশে জাতিসত্তাগত অবস্থান ভারী জরুরি হয়ে ওঠে সময়ে সময়ে। সেই জাতিসত্তার ভিরে মিশে থাকে রান্নার নানা প্রকৌশল।

মানুষের সাহচর্যে রান্নাঘরের এই বদলে যাওয়া ভূগোলকে আমরা বুঝতে চেষ্টা করছি বিগত কয়েক বছর ধরে। ত্রিপুরার মনসা মাসীমা হোক বা সুভাষ গ্রামে থাকা কল্যাণীদি, এঁদের কাছে রান্নার এই বদলে যাওয়া সংস্কৃতির নিবিড় পাঠ আমায় সম্বৃদ্ধ করে। সেইসব রান্না শিখে নিতে চাই আমি কেবল। দিগলিপুরের বাজার ঘুরে তাই আট নম্বর চাল কিনি। গোল গোল নিটোলা চালের পায়েস রান্না করি। অচেনা স্বাদের কাছে ফিরে যাই অভিপ্রয়াণের ভিতরের সুরটিকে বুঝবো বলেই। এই তো, বর্ষা আসবে আর কিছুদিনে। লেমনগ্রাসের ঝাড় ঘন হয়ে উঠবে। তখন লেমনগ্রাসের ডাঁটি দিয়ে বার্মিজ ইলিশ রান্না করবো। প্রেসার কুকারের বাষ্পে সম্মিলিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে রেঙ্গুন শহরের কথা মনে পড়ে যাবে আমার। শুধু রেঙ্গুন কেন! মায়াবন্দরের বার্মা কলোনি বা ক্যরেনদের গ্রাম ওয়েবির রান্নাঘরে আমি দেখেছি, একশো বছর ধরে সঞ্চিত ধানবীজ থেকে কীভাবে তারা দেশজ চালের চাষ করছেন। সকাল সকাল আঠালো ভাতে নারকেল কোরা আর মধু দিয়ে জলখাবারের স্মৃতি অমলিন। অমৃতসরের মাসীমা আমায় শেখালেন ইলিশের নতুন রান্না, শাহজাদপুরের গন্ধ এলো আমার রান্নাঘরেও। আসলে সেভাবে বলতে গেলে এই যে ঘুরে ঘুরে মানুষের সঙ্গ প্রত্যাশা, এ হলো আমাদের থিওরির মতো। আর সেই রান্নাকে আমাদের বল্লভপুরের(শান্তিনিকেতন) বাড়িতে যখন রূপ দিতে চাই, সে হলো এক রকমের প্রাকটিক্যাল ক্লাস। রান্নাঘরকে ল্যাব বলা চলে কিনা আমি ঠিক জানি না। কিন্তু কবেকার চট্টগ্রামের পিঠাকে রুপ দিতে ধানের যে অঙ্কুর আমি জন্ম দিই রান্নাঘরের মাটির পাতিলে, সে যেন ইতিহাসেই ডুব দেওয়ার সমান। সেই অর্থে আমাদের এই রান্নাঘরে আমি মানুষকে ছুঁয়ে থেকে মানুষের রান্নাঘরকে খুঁজছি প্রতিদিন। গোদক রান্না করতে করতেই হোক বা তারিণী মাছের খাট্টা সুরুয়াই হোক – আমি আসলে এক ভ্রাম্যমান ইস্কুলের ছাত্র মাত্র। মানুষের সান্নিধ্য আর ভ্রাম্যমান এই যাপন ছাড়া তা সম্ভব ছিল না। খাদ্য খাবারের নৃতত্ত্বকে এভাবেই ছুঁয়ে দেখতে চাইছি রান্নাঘরের নিবিড় সান্নিধ্যে। মানুষের মগজ, তার স্বাদকোরক যে ইতিহাসকে বহন করতে পারে, তেমন আর কেই বা পারে!

আমি কেবল আন্দামান থেকে ত্রিপুরা হয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাই সময়সারণীকে। ক্রমে ক্রমে টের পাই এই আমাদের দেশ, এই আমাদের ভারতবর্ষ। মানুষের ক্রমাগত এই জঙ্গম যাপন ফুরোবার নয়। এ হলো পৃথিবীর আদি সমাচার। মানুষের হাড়ি-পালিতে সে কেবল ছাপ ফেলে যায়। সেই ছাপ মোছা যায় না। মুছে ফেলবার নয়। স্মৃতি সত্তায় সে জেগে থাকে অবিরত। তবু, এই চিন্তা অবান্তর নয়। – এই পৃথিবী বিশ্বায়নকে বুঝেছে। স্বতন্ত্রকে সে আর সব সময় স্বীকৃতি দিয়ে চায় না। সব যদি এক ছাঁচে ঢালাই করা মুখ হয়ে ওঠে! সেদিন ভাতের থালায় এই অভিপ্রয়াণের ইতিহাস মুছে যাবে হয়তো। তবু, মানুষের মন তো। সে তাই বিশ্বায়নকে পিছনে ফেলে মানুষের এই জয়যাত্রার আদি সমাচারে ডুবে থাকতে চায়। রান্নাঘরও তেমনটিই চায় হয়তো।

*Photos courtesy the author
